ইরানে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলা: উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের পাল্টা হামলা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 28 Feb, 2026
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে আগুনের স্ফুরণ দেখা গেছে, তা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়; বরং গত কয়েক দশকের ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী সংঘাতের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা 'পারমাণবিক আলোচনা' আসলে একটি কূটনৈতিক ধোঁয়াশা ছিল, যার আড়ালে হামলার ছক কষা হয়েছিল। আকাশ ও সমুদ্রপথ থেকে ইরানের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী তেহরানের 'ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট' এবং 'জামহুরি' এলাকায় হামলা চালিয়ে ইরানের নেতৃত্বকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
খামেনির কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলাটি ছিল একটি প্রতীকী বার্তা—যাতে বোঝানো হয়েছে যে কোনো 'রেড লাইন' আর অবশিষ্ট নেই।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক এবং বিধ্বংসী। তারা কেবল ইসরায়েল নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের মূল ভিত্তি অর্থাৎ আরব মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।
আক্রান্ত দেশ | লক্ষ্যবস্তু | কৌশলগত গুরুত্ব |
কাতার: আল উদেইদ বিমানঘাঁটি | মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক কেন্দ্র। |
সংযুক্ত আরব আমিরাত:| আবুধাবি ও আল ধাফরা | বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বাণিজ্যিক ও জ্বালানি কেন্দ্র। |
৫ম নৌবহর সদরদপ্তর | পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌ-আধিপত্যের মূল চাবিকাঠি। |
কুয়েত | আল সালেম বিমানঘাঁটি | মার্কিন লজিস্টিক সাপোর্টের প্রধান কেন্দ্র। |
ইরান এই দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যদি তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন হামলা হয়, তবে মার্কিন ঘাঁটি পরিচালনাকারী আরব দেশগুলোও নিরাপদ থাকবে না। এটি আসলে আরব দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মাটি ব্যবহারের অনুমতি না দেয়।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও রুশ অবস্থান
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দিমিত্রি মেদভেদেভ যে 'আসল চেহারা'র কথা বলেছেন, তা মূলত মার্কিন ডেমোক্রেসি এবং কূটনীতির প্রতি একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। মধ্যপ্রাচ্যে এই অস্থিরতা রাশিয়ার জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরানোর একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্পের 'বিগ গেম': ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং ভিডিও বার্তার মাধ্যমে 'ইরানিদের সরকার পতনের' আহ্বান একটি রেজিম চেঞ্জ (সরকার পরিবর্তন) মিশনের দিকে ইঙ্গিত করছে।
পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী বিশ্বের তেলের ৩০ শতাংশ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এই অঞ্চলে যুদ্ধ মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম রাতারাতি ব্যারেল প্রতি ১৫০-২০০ ডলারে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা।
কাতার, আমিরাত ও কুয়েতের আকাশসীমা বন্ধ হওয়া মানে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যকার বিমান যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, যা বিশ্ব পর্যটন ও পণ্য পরিবহনে ধস নামাবে।
তেহরান এবং অন্যান্য শহরে হামলার ফলে যে শরণার্থী সংকটের সৃষ্টি হতে পারে, তার চাপ তুরস্ক এবং ইউরোপের ওপর গিয়ে পড়বে।
ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট: পরবর্তী কী হতে পারে?
ইরান বর্তমানে তাদের 'রিভেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি' বা প্রতিশোধমূলক কৌশল গ্রহণ করেছে। তাদের হাতে থাকা শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন বাহিনী যদি ইসরায়েলের জনবহুল এলাকা বা মার্কিন জাহাজগুলোতে সরাসরি আঘাত হানে, তবে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের "আত্মসমর্পণ নতুবা মৃত্যু" নীতি ইরানকে কোণঠাসা করে দিলেও, ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্ব সম্ভবত মরণপণ লড়াইয়ের পথ বেছে নেবে।
এই সংঘাত কেবল ইরান বনাম ইসরায়েল নয়, বরং এটি পশ্চিমা শক্তি বনাম মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ ব্যবস্থার এক চূড়ান্ত লড়াই। আগামী ৪৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করবে বিশ্ব কি এক নতুন তেলের সংকট ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে, নাকি পর্দার আড়ালে কোনো বড় সমঝোতা হবে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

